সোমবার, ৭ জুন, ২০১০

পিপিপিঃ কল্যাণ রাষ্ট্রের সেবাখাত চলে যাচ্ছে বেসরকারীখাতে!


নাজমুস সাকিব

সহজ পাঠ
পিপিপি হচ্ছে দুই পক্ষের সম্মিলিত এক কারবার। একপক্ষ সরকার এবং অন্য পক্ষ এক বা একাধিক বেসরকারী পুঁজি লগ্নিকারী। ধরে নেয়া হয় যে, প্রত্যেক পক্ষ অপর পক্ষের চেয়ে নিজ ভূমিকা পালনে বেশী দক্ষ ও কার্যকর। সরকারী খাতের তুলনামূলক সুবিধাগুলো হচ্ছে, এটি ভাল তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়া মান নির্ধারণ, প্রস্তাবনা তৈরী,চুক্তি সম্পাদন, সময় নিয়ন্ত্রণ, পারফরমেন্সের লক্ষ নির্ধারণ,শর্তারোপ, ফান্ড সরবরাহ, রিক্রুটিং, মূল্য নির্ধারণ, এধরণের কাজের জন্য সরকারী খাত অপরিহার্য। অপরদিকে প্রাইভেট সেক্টর কাজ শুরুর পরে আসল কাজগুলো করে।
এখানে সরকারের দিক থেকে যে সংস্থাগুলো জড়িত তা হচ্ছে- কেন্দ্রীয় সরকার, জেলা প্রশাসন, মিউনিসিপ্যাল কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকারের অন্যান্য সংস্থাসমূহ, সরকারী কর্পোরেশনগুলো, সরকারী হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। আর বেসরকারী পক্ষগুলো হচ্ছে- বানিজ্যিক লাভজনক প্রতিষ্ঠান, এনজিও, কো-অপারেটিভ সোসাইটি, ট্রেড ইউনিয়ন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবি সঙ্ঘ, কমিউনিটি ভিত্তিক সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং অতিঅবশ্যই পরিবার। সাধারণত সরকারী খাতের কিছু সীমাবদ্ধতা যেমন পুঁজি বা দক্ষ জনবলের অভাবের কারণে এই পার্টনারশীপের কথা চিন্তা করা হয়। কিছু কিছু পিপিপি শুধুমাত্র যারা সেবা লাভ করে তাদের কাছ থেকে অর্থায়ন করা হয় যেমন টোল বা স্পেশাল ভ্যাট আদায়; আর অন্য পিপিপিগুলো সাধারণ ট্যাক্সের টাকায় অর্থায়ন করা হয়।
সাধারণত প্রাইভেট কম্পানীগুলোর একটি দল মিলে তৈরী করে Special Purpose Vehicle (SPV) । এই এসপিভি প্রজেক্টের ব্যবহারের জন্য সম্পদ সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং পরিচালনা করে। এসপিভিই সরকারের সাথে এবং সাবকন্ট্রাক্টরদের সাথে কাজ পরিচালনার জন্য চুক্তি করে এবং পুরো কাজ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধান করে।
এতো গেল পিপিপি কিভাবে চলে তার কথা। কিন্তু পিপিপি করার প্রয়োজন পড়ল কেন? অনেকেই মনে করেন পিপিপি হচ্ছে স্রেফ সুন্দর পোষাক পরিহিত বেসরকারীকরণ। সোজাসাপ্টাভাবে সরকারী জিনিসপত্র বেসরকারী খাতে ছেড়ে দেবার কথা মুখে বলতে যাদের শরমিন্দা, আবার সরকারের আকার ছোট করতেও যাদেরকে অমোঘ আকর্ষন টেনে নিয়ে যায়, তাদের জন্য পিপিপির চেয়ে আশীর্বাদময় কোন কিছুই হতে পারেনা। যেহেতু কম্পানির কাজ হচ্ছে মুনাফা কিভাবে বাড়ানো যায় সে চিন্তা করা সুতরাং সে অতিরিক্ত লাভ না পেলে কাজ হাতে নেবেনা।আর যদি সে পিপিপিতে মুনাফা করতে সক্ষম হয় তবে এই মুনাফার টাকাটা আসবে জনগণের পকেট থেকে। এটাই হচ্ছে সেই লোভনীয় কারণ যার জন্য “প্রফিট ম্যাক্সিমাইজিং ফার্ম” জনসেবায় আসতে চায়।

গোড়ার কথা
পিপিপি একেক দেশে একেক চরিত্রে একেক নামে চলেছে। উইকিপিডিয়া বলছে প্রথম এটা ১৯৯২ সালে ইউকে তে চালু হয়েছিল। তখন অবশ্য এর নামটা ছিল পিএফআই- প্রাইভেট ফাইন্যান্স ইনিশিয়েটিভ। পাবলিক সেক্টরের ঋণের বোঝা কমানোই এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। এরপর আমেরিকাসহ অনেক দেশেই অনেক নামে এটা চলেছে। ইন্ডিয়ায় বছর দশেক হল এই প্রজেক্ট বেশ দাপটের সাথে এগিয়ে চলছে। সিঙ্গাপুরে “ভ্যালু ফর মানি” এই হিসেবে পিপিপি চলছে। দক্ষিন কোরিয়ায় প্রথম দিকে অবকাঠামো তথা রাস্তাঘাট করা দিয়ে শুরু হলেও যেসব সেবাখাত পুঁজিপতিদের নাগালের বাইরে ছিল সেগুলোই বেসরকারীখাতের করায়ত্ত হয়েছে। মালোশিয়ার অবস্থাটা একটু ব্যতিক্রম, এখানে রাজনৈতিক সংস্কার ও সামাজিক মটিভেশন পিপিপিতে একটা বড় ভুমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া নিউজিল্যান্ডের রয়েছে এবিষয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা। খোদ ব্রিটেনেও পিপিপির অনেক প্রকল্প শুরু করে হোঁচট খেয়েছে। মোটা দাগে বিশ্বব্যাপী পিপিপিকে দেখে কোন এক-কথার মন্তব্য করতে হলে এটুকুই বলা যায় যে বেসরকারীকরণের সাথে এর পার্থক্যটা খুঁজে বের করা খুব কঠিন।

বাংলাদেশে ২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেটেই প্রথম পিপিপির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন সরকারী সংস্থা ও কর্পোরেশনের বেসরকারী করণের নানান প্রক্রিয়ার শুরু আরো অনেক আগেই। বাজেটেরঅবস্থানপত্রে পিপিপির মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলোকে ৩ টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে: জনগুরুত্বপূর্ণ বৃহৎ প্রকল্প, জনগুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য প্রকল্প এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের প্রকল্প। অবস্থান পত্রে বলা হয়েছে, এই জনগুরুত্ব বিশাল প্রকল্পগুলো ৫-৭ বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে:

ঢাকা চট্টগ্রাম একসেস কন্ট্রোল হাইওয়ে (২২ হাজার ১০০ কোটি ৭০ লাখ টাকা), ঢাকা শহরের চারপাশে স্কাই রেল(১৯ হাজার ৩২০ কোটি টাকা), ঢাকা শহরে পাতালরেল ( ৮ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা),৪ টি ৪৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লা-ভিত্তিক অথবা ডিজেল ও গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্র (১২ হাজার ৪২০ কোটি টাকা)ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-গাজীপুর-ঢাকা এলিভেটেট এক্সপ্রেসওয়ে ( ১৩ হাজার ১১০ কোটি টাকা), এবং গভীর সমুদ্র বন্দর (অপ্রাক্কলিত)।

পেছনের যুক্তিগুলো
সবচেয়ে বেশী যে যুক্তিটি পিপিপির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় তা হচ্ছে সরকারের মূলধন সংকট ও তদসংশ্লিষ্ট অবকাঠামোগত দূর্বলতা। সাধারণ ধারণা হচ্ছে বেসরকারী খাত সরকারী খাতের চেয়ে বেশী দক্ষ। সরকারী খাতের দূর্নীতির বিপরীতে বেসরকারী খাতে অধিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় এধারণাটিও পিপিপির পক্ষে জোরালো এক যুক্তি। পিপিপিতে দক্ষ ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার দ্বারা প্রজেক্টের খরচ কমে আসে এমন কথাও প্রায়ই শোনা যায়। টেকনোলজির ক্ষেত্রে পিপিপির বিশেষ কি উপকারীতা তা যদিও বোধগম্য নয়, কিন্তু সকল এ্যাকাডেমিক ও ব্যবহারিক ক্ষেত্রেই টেকনোলজিকে পিপিপি থেকে প্রাপ্ত এক বিশেষ সুবিধা হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে একথা নিঃসন্দেহে সত্য যে পিপিপির ফলে উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসা বৃদ্ধির সুযোগ পায় যা দেশের মোট উন্নয়নে ভাল ভূমিকা রাখতে পারে। এর ফলে প্রাইভেট সেক্টরের বিশেষায়িত সেবা পাবলিক সেক্টরের লোকেরা পেতে পারে। এছাড়া ঝুঁকি বহনের ক্ষেত্রে বলা হয় যে ঝুঁকি বহনের সবচেয়ে যোগ্য লোকেরাই এটা সামলানোর কাজ পায়। কাজ যথাসময়ে শেষ করার নিশ্চয়তা পিপিপির একটি বড় সুবিধা।
বাস্তব সমস্যা
এতক্ষন পিপিপির ব্যাপারে যেসব সুবিধার কথা বলা হল তা প্রায় সবই হচ্ছে বইয়ের ভাষার কথা। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পিপিপির কিছু সমস্যা রয়েছে। সরকারের সবচেয়ে বড় যে সীমাবদ্ধতার জন্য পিপিপির দিকে আসা তা হচ্ছে মূলধন স্বল্পতা। বলা হয় বেসরকারী খাত হাজার হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে সহজেই টাকা নিয়ে এগিয়ে আসবে। আরেক দিকে দেশের ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত্ব তারল্যের পরিমাণ দিনকে দিন বাড়ছে।পত্রিকাগুলোতে এই উদ্বৃত্ত্ব তারল্য কিভাবে বিনিয়োগযোগ্য করা যায় সে ব্যাপারে অর্থনীতিবিদদের হাউকাউয়ের কোন কমতি নেই। তাহলে এই টাকা সরকারের হাতদিয়ে খরচ হলে সমস্যা কোথায়? বলা হচ্ছে বেসরকারী বিশেষায়িত পুঁজি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারী খাত তথা জনগন লাভবান হবে যদি পিপিপি বাস্তবায়ন করা হয়। আমাদের কি এই প্রশ্ন তোলার অধিকার নেই যে, প্রস্তাবিত বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড বা বিআইআইএফ এর মাধ্যমে বন্ড বা শেয়ার ছেড়ে এই বেসরকারী পুঁজি বিনিয়োগে সমস্যাটা কোথায়?
যদি ধরে নেয়া হয় যে কম্পানী জনসেবা করতে বাজারে আসেনি তবে প্রজেক্টে অবশ্যই মুনাফা নিশ্চিত করে তবেই সে বাজারে এসেছে। প্রশ্ন হচ্ছে এই মুনাফার টাকাটা কোন গৌরী সেন দিচ্ছে? কম্পানীর প্রস্তাবিত ভাড়া/টোল/সার্ভিস চার্জের পরিমাণটা কার্যকর ভাড়ার চেয়ে পার্থক্যটা সরকার ভর্তূকির মাধ্যমে পূরণ করছে। কম রেটে ভাড়া নির্ধারণ করা হলে দক্ষিণ আফ্রিকার শঙ্কাটা জিইয়ে থাকছে। সেখানে কম্পানীগুলো সরকারী ভর্তুকি পেয়ে ১০ লক্ষ ফ্ল্যাট তৈরির পর মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে জবাব দিয়েছিলঃ “নিজেদের মুনাফা ধরে রেখে এর চেয়ে উন্নত মানের ফ্ল্যাট তৈরী সম্ভব ছিলনা”।
সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে বলার চেষ্টা করা হয়েছে পিপিপির ফলে প্রাইভেট সেক্টরের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সরকার লাভবান হবে। আমাদের অবাক লাগে যে, প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সরকার আর কতকাল পরনির্ভরশীল নপুংশক হয়ে থাকবে? তাহলে কেউ কি সরকার কে মানা করেছে আত্ননির্ভরশীল হতে? সরকারী উর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে পত্রিকা রিপোর্ট করছে যে, পিপিপি বিভিন্ন সেবা সরবরাহে প্রাইভেট সেক্টরের অংশীদারিত্ব বাড়াবে। নিশ্চয়ই! এবং তার ফলে পাবলিক সেক্টর আরো ছোট হবে।“That government is best which is least” এই স্লোগান বাস্তবায়ন সহজ হবে!
পিপিপির পক্ষের একটি বড় যুক্তি হচ্ছে বেসরকারী খাতে দূর্নীতি নেই তাই এখানে খরচ কম। আসলে বেসরকারী খাতের জন্য বৈধভাবেই অতিরিক্ত লাভ করার ব্যবস্থা আছে। ব্যবসা করতে এসে জনগনের খেদমত করার দায়িত্ব কম্পানির নয়। বলা বাহুল্য কর্পোরেট সোশ্যাল রেস্পন্সিবিলিটির (সি.এস.আর) ফান্ড দিয়ে পিপিপি করার চিন্তা বা “দুঃসাহস” মাল মুহিত সাহেব দেখাননি! আর যে দূর্নীতির কথা সব সরকারী কাজের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দেখা দেয় তার প্রতিরোধ কি কার্টুন ছবি আঁকা আর বিদেশী টাকায় সেমিনার করে “দূর্নীতি থামাতে হবে এখনই” জাতীয় স্লোগানে পরোক্ষভাবে দূর্নীতির বিজ্ঞাপন দিয়ে সারা পৃথিবীকে জানানো ছাড়া আর কিছুই নয়?
পিপিপিতে প্রাপ্য সেবার ক্ষেত্রে মান কতটুকু বজায় রাখা যাবে সেটি একটি অত্যন্ত বড় চিন্তার কারণ। প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে যেটুকু সময় বেসরকারী প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের দেখাশোনা তথা ভাড়া তোলা জাতীয় কাজে ব্যস্ত থাকবে; তার পর যখন সরকারের কাছে হস্তান্তর করে চলে যাবে সে সময়ের যেকোন ত্রুটির (ধরা যাক, এখন যেমন যমুনা সেতুতে ফাটল দেখা যাচ্ছে) মীমাংশা কিভাবে হবে তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ না করা হলে টেংরাটিলা জাতীয় “দূর্ঘটনা (?)” ঘটলে সরকার দর্শকের ভূমিকা পালন করবে।এছাড়া ঝুঁকি বহনের ক্ষেত্রে যে দূর্ঘটনা এখনো ঘটেনি তবে ঘটবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে তার জন্য সরকারকে একটা নির্ধারিত চার্জ দিতে হবে। ব্রিটেনের অভিজ্ঞতা হচ্ছে এসব চার্জ সবসময়ই বেশী করে দেখানো হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে আরো বলা হচ্ছে কাজ সময়মত শেষ করার নিশ্চয়তা পিপিপিতেই পাওয়া যাচ্ছে। বাস্তবতা হচ্ছে যখনই এইসব কম্পানী তাদের এভারেজ ভ্যারিয়েবল কস্ট বা চলতি ব্যায় তুলতে ব্যার্থ হয় তখনই প্রযেক্ট বন্ধ করে; এটাই অর্থনীতির সূত্র। কিন্তু বিপদ এটুকু হলেও কথা ছিল। সাধারণত যেধরনের প্রযেক্ট পিপিপির আওতায় করা হবে তার সবই অতীব জনগুরুত্বপূর্ন কাজ। ফলে সরকার এসব প্রযেক্ট জনপ্রিয়তার ভয়ে বন্ধ করে না। তাই সকল বোঝা এসে পরে ট্যাক্স পেয়ারদের ঘাড়ে। ব্রিটেনের অভিজ্ঞতা হচ্ছে এধরণের প্রকল্পে রেলের কাজে কম্পানীর লোকশানের বোঝা টানতে হয়েছিল স্কুলের কাজে বলি দেবার মাধ্যমে।
কোন প্রকল্পের ব্যায় যদি কাজ চলাকালীন সময়ে বেড়ে যায় তবে তার মাশুল সরকার দিচ্ছে। যে ঋণ নিয়ে কম্পানী কাজ করবে তার সুদ বেড়ে যাওয়ার দায় সরকারের এবং ঋণের গ্যারান্টরও সরকার।কিন্তু সরকার যেহেতু দেউলিয়া হয়না তাই সরকার ঋণ নিলে ঝুঁকি খরচও কম। তাহলে সরকার নিজেই কেন কম খরচে ঋণ নেবেনা?
যদি কম্পানী দেখাতে পারে যে তাদের কস্টের পরিমাণ মোট রেভিনিউয়ের অপেক্ষাকৃত বড় অংশ জুড়ে আছে তবে সেই টাকাটা সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি এবং সেবা ব্যাবহারকারী জনগণের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করার মাধ্যমে উসুল করা যায়। তাই কস্ট বেশী দেখানোর একটা প্রবণতা সবসময়ই লক্ষনীয়। এছাড়া কয়েকটি পক্ষ একত্রিত হয়ে যাচাই বাছাই,পরিকল্পনা, বেসরকারী কম্পানীর উপর সরকারের নজরদারী এসবের কারণে বাস্তবায়ন এবং পরিচালনা খরচ বেড়ে যায়। তাই পিপিপিতে খরচ কম হবার কথাটি একটি স্রেফ বাজে কথা।
পিপিপি হলে জনগন তাথেকে কেমন সার্ভিস পাবে তা দেখা যেতে পারে এখনকার কিছু “আধা-পিপিপি” প্রকল্প থেকে। এখনই কয়েকটি বেসরকারী বিদ্যুত প্রকল্প থেকে সরকার বেশী দামে বিদ্যুত কিনে ভর্তুকী দিয়ে বিদ্যুত সরবরাহ করছে। পিপিপির মাধ্যমে যে বিদ্যুত পাওয়া যাবে তার দাম এর চেয়ে বেশী ছাড়া কম হবেনা। ফলে পিপিপির মাধ্যমে যতধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে তা বিদ্যমান সরকারী আওতাধীন সেবার তুলনায় বেশী দাম দিয়ে কিনতে হবে। ফলে একদিকে জনগণ বেশী ভাড়া দেবে আর অন্যদিকে কম্পানীকে দেয়া ভর্তুকীর টাকাটা আসবে ট্যাক্স থেকে। কি দারুন। পিপিপি কে মনে হচ্ছে এমন তরবারী যার ধার দু’দিকে।
কল্যাণ রাষ্ট্রের সেবাখাত বেসরকারী খাতে!
আওয়ামীলীগের ইশতেহারের ভিশন ২০২১ এ লেখা ছিলঃ “We envision a liberal, progressive and democratic welfare state” welfare state বা কল্যাণ রাষ্ট্র পৃথিবীতে যে কয়টি দেখা যাচ্ছে তাদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মত সেবা খাতগুলো সরকারের ব্যপক ভর্তুকিতে চলে। একদম ফ্রি সেবার কথা বাদ দিলেও কিভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠি এইসব সেবা বিনামূল্যে পাবে তা নিশ্চিত করা কল্যাণ রাষ্ট্রের দ্বায়িত্বের মধ্যে বিবেচিত হয়। আওয়ামীলীগ তো বটেই এর বাইরের সরকার গঠনকারী কোন দলের জন্য ও বাংলাদেশের ইতিহাসে কল্যাণ রাষ্ট্রের ঘোষণা এটাই প্রথম। তাই স্বভাবতই জনগণ আশা করেছিল যে শিক্ষা স্বাস্থ্যের মত সেবা খাতগুলো ধীরে ধীরে আরও সুলভ হবে। কিন্তু আদতে দেখা যাচ্ছে পিপিপির মাধ্যমে এসব খাতও আসলে বেসরকারী খাতে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ এগুলো আগে বেসরকারী পুঁজিপতিদের নাগালের বাইরে ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল সমস্যা বা বারডেম এর মত হাসপাতাল পিপিপির আওতায় আসলে এগুলোর খরচ কমবে না বাড়বে তা সহজেই অনুমেয়। প্রান্তিক পর্যায়ে শিক্ষাখাত বেসরকারীকরণের ফলাফলাটা কি প্রাইমারী শিক্ষা ব্র্যাকের হাতে ছাড়ার সিদ্ধান্তে শিক্ষকদের সহিংস প্রতিবাদ থেকে বোঝা যাচ্ছে না?
ডেপুটি কম্পট্রোলার ও অডিটর জেনারেল মুহাম্মাদ জাকির হোসেন, “Public-Private PartnershipBangladesh Perspective” শীর্ষক এক পেপার প্রেসেন্টেশনে বাংলাদেশের স্বাস্থখাতের বিভিন্ন সমস্য যেমনঃ নূন্যতম মান না থাকা, দূর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, দূর্ব্যবহার তুলে ধরে বললেন এগুলো দূর করতে স্বাস্থ্যখাত পিপিপির আওতায় আনা হলে এটা আরও কার্যকর, গ্রাহক বান্ধব, এবং বেশী ব্যবহৃত হবে। তিনি যে বিষয়টা বললেননা তা হচ্ছে খরচ বেড়ে যাবে বহু বহু গুণ। ঢাকা মেডিক্যালের চেয়ে স্কয়ার বা এ্যাপোলো হাসপাতালের সেবা খুব ভালো এ আর নতুন কী কথা?এই পেপারে আরও বলা হচ্ছে, “The principles of “non-rivalry” and “non-exclusion” of public goods logically point to the criteria of universality and equity in judging the value of partnership” কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে পিপিপির ফলে অবশ্যই সরকারী প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিশোধকৃত টোল বা ভাড়ার চেয়ে বেশী টাকা জনগনের পকেট থেকে যাবে। অর্থাৎ আরও বেশি লোক এই সুবিধা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে। যা সঙ্গানুসারেই “পাবলিক গুডস” এর সাথে সাংঘর্ষিক। তাই আমরা দেখতে পাচ্ছি কল্যাণ রাষ্ট্রের সেবাখাত ছেড়ে দেয়া হচ্ছে বেসরকারী খাতে!


শেষ কথা
আমাদের কথা পরিষ্কার, যদি পিপিপির মাধ্যমে বেসরকারী বিনিয়োগকারীরা বাজারদরের অন্য বেসরকারী বিনিয়োগের চেয়েও বেশি মুনাফা পায় তবে বুঝে নেব এই মুনাফার যোগান দিচ্ছে জনগণ। জনগণের টাকা কিভাবে কম্পানীর মুনাফায় রূপান্তরিত করা যায় সে দায়িত্ব সরকারের নয়। বরং সরকারের দ্বায়িত্ব হচ্ছে জনগণের স্বার্থ দেখা।
একজন উর্ধ্বতন সরকারী কর্মকর্তা এক সেমিনারে পিপিপির প্রশংসা করে বলেছিলেনঃ“Allowing for the reduction in the size of the public agency and the substitution of private sector resources and personnel”কি আশ্চর্য! সরকারের দায়িত্ব কি বেসরকারী খাতের স্বার্থ রক্ষা করা এবং সরকারী খাত সংকোচন করা? নিজের ভাল নাকি পাগলও বোঝে! খালেদা জিয়ার সরকার ছিল ঘোষিত নয়া উদারনৈতিক অর্থব্যবস্থার সরকার। কিন্তু এবারকার বাম চেহারার ডজনখানেক বিপ্লবী মন্ত্রী এবং একপাল পোষা মস্কো ফেরত অর্থনীতিবিদ সর্বস্ব সিপিডির সরকার এই পলিসি বাস্তবায়ন করছে। আওয়ামীলীগের কাছ থেকে প্রথমে কল্যাণ রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা এবং প্রে সেবা খাতের বেসরকারীকরণ দেখে মনে পড়ে যাচ্ছে যে রামছাগল দিয়ে হালচাষ হয় না।
পিপিপির যে দিকটা অনেক সরকারকে উৎসাহ জুগিয়েছে তাহল এর ম্যানেজমেন্ট এর দক্ষতা। এখানে কথা হল ম্যানেজমেন্ট আর মালিকানা দুই জিনিস। ম্যানেজমেন্ট বেসরকারী হাত ঘুরিয়ে যদি ভাল চালানো যায় তবে ক্ষতি কী? কিন্তু আমাদের প্রাণ ও সম্পদের মালিকানা চমৎকারভাবে বেসরকারীকরণ কোন যুক্তিতেই মেনে নেয়া যাবে না।

সূত্রঃ
১। প্রথম আলোঃ ১২ই জুন ২০০৯
২।নিউ এইজঃ ২০ই আগস্ট ২০০৯
৩। Miraftab, 2004. Public-Private Partnerships The Trojan Horse of Neoliberal Development?
৪। Paper presentation: Public-Private Partnership Bangladesh Perspective by Mohammad Zakir Hossain; Deputy Comptroller and Auditor GeneralOffice of the Comptroller and Auditor General of Bangladesh
৫। Wikipedia
৬।দিনমজুর ব্লগ, http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog
৭। বাঙ্গাল ব্লগ, http://www.somewhereinblog.net/blog/troublekid
৮।Paper presentation: Building Public Private Partnership in Bangladesh by Mustafa k. Mujeri.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন